বাওকুমটা বাতাস যেমন (পর্ব ৩)

সুবীর সরকার


৯.
উজান ভাটির ব্যপ্ততায়,জায়মান এক বিস্তার দিয়েই তো নদী ধরলাকে চিনতে হয়!নদীর উজান থেকে ফিরতে থাকা পাখিরা দিকদিগন্তের দিকেই উড়ে যায়।তখন বড়বাড়ী থেকে পাঙ্গা রাজবাড়ী থেকে রাজারহাট থেকে দুর্গাপুর থেকে কেবল গানের পর গান উড়ে আসে।জনপদের পর জনপদ ভরে উঠতে থাকে গানের সুরের মত্ততায়।ইয়াকুব মুন্সি তার ঘাড়ের গামছায় মুখ মুছে একসময় গানের ভূগোল ইতিহাস মিথের ভেতর অনুপ্রবেশ করেন।আর এক পর্বে আমরা দেখি ব্রহ্মপুত্র মিশে যায় নদী ধরলায়।
সেই মিশে যাওয়ার কোন চিহ্ন কি নদী বহন করে আদৌ!ইয়াকুব তার ঈষৎ অন্যমনস্ক চলাচল নিয়েই গঞ্জ কিংবা হাটের অংশ হয়ে উঠতে থাকে একসময়।
গান থামে না।গান পল্লবিত হয়।গানের পরিবর্ধিত টুকরোয় নদীর জলের শব্দ কখন বুঝি মিশেই যায়।
ইয়াকুবের চোখের তারায় পুরোন দিনকাল ছায়া ফেললে অথবা ছায়া বিছিয়ে দিলে ইয়াকুব তিস্তা পারের জনজীবনের গানগুলি তার স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনতে থাকেন_
"তিস্তা পারের সোনার ময়না রে
ও ময়না না যান নালমনিহাটতে"
এভাবে বাতাসের ভেতর,আকাশের নিচে,নদীর সজলতায় গান নিয়ে নাচ নিয়ে হর্ষ বিষাদ বাদ্য বাজনা নিয়ে মানুষ তার বেচে থাকাটাকে একপ্রকার উদযাপনই করে হয়তো বা।
১০.
নাসির আলীর জীবন জুড়ে অদ্ভুত এক জোতজমির
গল্প।নদী ভাঙ্গনের গল্প।নদীগর্ভে বিলীন হওয়া জমিজিরাতের গল্প। মুন্সীবাড়ির জোতদারদের পুরোন জৌলুসের গল্প গুলি সঙ্গে নিয়েই নাসির আলী জনপদের পর জনপদে ঘুরে বেড়ান।সে প্রথমে গান দিয়েই তার কিসসা শুরু করে।তারপর নাসির জমে উঠতে থাকা জমায়েতকে এই ১৬ নদীর দেশের কিছু কথা শোনায়।তারপর শুরু হয় তার ভাঙন,নদী,মুন্সিবাড়ি আর জমিজিরাতের গল্প।
নাসির আলী কিভাবে বুঝি আস্ত এক আবহমান কথক হয়ে ওঠে।তার শরীরে পালাটিয়ার নাচের ছন্দ নতুনত্ব এনে দেয়।নাসির আলী জনপদের পর জনপদে এভাবেই গল্পের বিস্তার গুঁজে দিতে দিতে এক অলীক মানুষে রূপান্তরিত হয়ে যান।
আর নাগেশ্বরী থেকে উঠে আসা গানের অদ্ভুত সুরের মায়া রৌমারী অতিক্রম করে জামালপুরের দিকে চলে যায়।এক গঞ্জ থেকে কণ্ঠে গান,শরীরে নাচের দুলুনি নিয়ে নাসির আলী পা বাড়ান অন্য কোন গঞ্জের দিকে।
১১.
মানুষের চলাফেরায় একটা ছন্দ আছে।ম্যাজিক আছে।আসলে চলাফেরা দিয়েই তো মানুষকে অতিক্রম করতে হয় মস্ত এক মানবজীবন।সেই জীবনের গহিনে থরে থরে সাজানো থাকে তিস্তা নদীর পুটি মাছ,হাউসের মস্ত বিলের শিথান থেকে কুড়িয়ে আনা ঢেঁকি শাক, কুরুয়া পংখির কান্নার বিলাপ,আন্ধন ঘরের নিভে যাওয়া উনুন আরও কত কিছু।
ইয়াকুব মুন্সীর হেঁটে যাবার দ্রুততায় জনপদে জেগে উঠতে থাকে নুতন কোন গল্পের সূত্র।সেই সূত্রকে অনুসরণ করে সন্ধ্যের মুখে মহিষের গাড়ি ক্ষেত মাঠ থেকে বুঝি ফসলের সুসমাচার বহন করে আনতে থাকে।গাড়িয়াল গান ধরলে সন্ধের পাখিরা কি পথ হারায়!তারা কি দ্বিধা নিয়ে তাদের গতিপথ বদলেই
ফেলে!না কি গাড়িয়াল বন্ধুর গান একসময় বাধ্যত মৈশাল বন্ধুর গানে প্রবিষ্ট হয়ে পড়ে_
"তোমরা যাইবেন কুড়িগ্রাম মৈশাল রে
ও মৈশাল কিনিয়া রে অনিবেন কি"
গানে গানে জমে ওঠা জীবনযাপনের খুব ভেতরে ঢুকে পড়তে পড়তে আবার ইয়াকুব মুন্সী তার ঘাড়ের
রঙ্গিলা গামছায় কপালের ঘাম মুছে নেয়।তার শরীরে আবার দ্রুততা এসে পড়লে ইয়াকুব নিজেকে ধরলা নদীর উজান ভাটির বিস্তারের ভেতর অনুপ্রবিষ্ট করেই ফেলে সাবলীল সব গানের কলির মত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

প্রাসঙ্গিক ও মার্জিত মন্তব্য করুন