সুবীর সরকার
১৫.
ধরলা নদীর দীর্ঘ চরে কিংবা বলা ভালো চরের বালুবাড়িতে জোড়া মহিষ নিয়ে নেমে পড়ে খলিল উদ্দিন।এখন অগ্রহায়ন মাস।বিরান নদীর চরভূমিতে
জেগে আছে খড়ের জঙ্গল।শেয়ালের দৌড়।দূরে দূরে
কলার বাগান।কত পাখ পাখালি।ধরলার শীর্ণ সোতায় মুখ ডুবিয়ে খেলা করে,মাছ ধরে কোড়া পংখি।সেই জলের ভেতর একটু বাদে মহিষ জোড়া সহ নেমে যাবে খলিলউদ্দিন। সে এক মৈশালের ঘরের চেংড়া।দীর্ঘ পেশীবহুল শরীরে একটা প্রকান্ড শালগাছের মতন।তার যুবক শরীরে অঘ্রানের মিঠা
রোদ পিছলে পিছলে যায়।মাথায় গামছা পাগড়ির মতন জড়ানো।একসময় খলিলউদ্দিন সেই জোড়া মহিষের একটির পিঠে লাফ দিয়ে উঠে বসলো।কোমরে বেঁধে রাখা নিম কাঠের দোতরা বের করে সে গান গাইতে শুরু করলো_
"আজি ছাড়িয়া না যাইস
ও মোর বাচ্চা মৈশাল রে
কুড়িগ্রামের মৈশাল মুই
গাইবান্ধার কইনা তুই
তোর পিরিতির দিছং রে বায়না"
তখন শূন্য নদীর দীর্ঘ চরের মধ্যে একটা অলৌকিক আবহ নির্মিত হয়ে গেল।
১৬.
দুধকমল নদীর পাড়ে একবার গরুর গাড়ির চাকা ভেঙে গিয়েছিল জয়লাল গাড়িয়ালের।তখন শীতকাল।রাতের আঁধার জুড়ে অজস্র ঝিঁঝিঁর ডাক।
নদীর বুকে ঘন হচ্ছে কুয়াশা।দুধের সরের মত।
দূরে কাছে রাতচরা পাখির পাখসাট।সামনেই কিছু এগিয়ে কাকিনার জমিদারের কাচারি বাড়ি।সেই কাচারির পেছন থেকে শুরু হয়েছে বগাখেতার গভীর জঙ্গল।সব মিলিয়ে একটা ছমছম করা পরিবেশ।
জয়লাল গাড়িয়াল তার দেড় কুড়ি বছরের গাড়িয়ালি জীবনে এমন বিপদে আর কখনো পড়েনি।গাড়ির নিচে একটা ন্যামফো দুলছে।ভেতরে ছইয়ের নিচে এক নুতন বিয়ের নাইওরি কইনা স্বামীর বাসায় ফিরছে।জয়লাল তার গাড়ির চাকা ঠিক করতে করতে শুনলো সেই কইনার খিলখিল চাপা হাসির শব্দ।আর গুনগুন করে সেই কইনা গানও গাইতে শুরু করলো গান_
"মুই নাইওর আর যাবার নং গাড়িয়াল
তোমার গাড়িত চড়ি
তোমার গাড়ির চাকাত নাগি
ছিড়িয়া গেইছে মোর বিয়ায় শাড়ি"
সেই শীতরাত,সেই নির্জনতায় ডুবে থাকা নিঃসঙ্গতা,তীব্র জাড়,গরুর গাড়ির গরু দুটির লেজের নড়াচড়ার শব্দ আর নাইওরি কইনার গান_সব মিলিয়ে একটা ঘোর আজও কুয়াশার জাদুবিস্তারের মত জয়নাল গাড়িয়ালের স্মৃতির ভেতর তীব্ররকম হয়ে জেগেই আছে।
১৭.
সুন্দরগঞ্জের হাটে গোবিন্দগঞ্জের হাটে নবগঞ্জের হাটে নাগেশ্বরীর হাটে বারবার ইয়াকুব মুন্সীর সঙ্গে হাজী সাহেবের দেখা হয়।এই দেখাসাক্ষাৎ হওয়াটা আসলে চিরকালীন কোন গানের মত।বারবার শুনেও পুরোন না হওয়া গানগুলি শুনবার হাউস কিন্তু কিছুতেই মেটে না।হাজী সাহেব তার জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো হাটে হাটে বৃত্তান্তের মত করে বলেই যেতে থাকেন।আর সেই গল্প জুড়ে জুড়ে আস্ত এক রূপকথা বিনির্মিত হতে থাকে বিরামহীনভাবেই।
হাজী সাহেবের বৃত্তান্তে একটা ডোরাকাটা বাঘ থাকে।থাকে সেই বাঘের গায়ের বোটকা গন্ধ।আচ্ছা সেই বাঘ কি কুচবিহারের মহারাজা নরেন্দ্রনারায়ণ ভূপবাহাদুরের শিকারের বন্দুক থেকে পালিয়ে আসা সেই বাঘ!এই সংবাদ একমাত্র বুঝি হাজী সাহেব জানেন।হাজী সাহেবের প্রায় একশো ছুঁই ছুঁই বয়সী শরীরে শীতের কাঁপন জাগে!হাজী সাহেব তার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে পুনর্বার আত্মমগ্ন হয়ে ওঠেন আর তাকিয়ে থাকেন আকাশে উড়ে চলা ধরলা নদীর বগা পংখির ঝাঁকের দিকে।আর কোথাও বুঝি গান বেজে ওঠে_
"তোমার বগা বন্দী হইছে
ধরলা নদীর পাড়ে রে"।

0 মন্তব্যসমূহ
প্রাসঙ্গিক ও মার্জিত মন্তব্য করুন