মাই গ্রিন মার্বেলস


▇  মূলঃ যোরান এম যোভানোভিজ
▇  অনুবাদঃ সাজেদুল ইসলাম


আমি আসছিলাম। প্রতিবেশী মহিলারা সারি-সারি জানালার ওপাশ থেকে আমাকে দেখেছিল। আমি যদিও তাদের মুখ দেখতে পাইনি কিন্তু জানতাম, জানালা গুলোর পর্দার আড়ালেই তারা ছিল। আমাকে তাকিয়ে দেখছিল। আমাদের বাড়ির সামনের দরজাটা ছিল খোলা। শুধুমাত্র ঐ খোলা দরজাটা ছাড়া আর সবকিছু যেমন ঠিক তেমনই ছিল। আমার মা, যতক্ষণ তিনি বাড়িতে থাকতেন, সামনের দরজাটা বন্ধ করে রাখতেন।

আর এখন তিনি বাড়িতেই ছিলেন অথচ দরজাটা ছিল খোলা। মা'র সাথে এবার দেখা করতে আমার কেমন ভয়-ভয় করছিল। ঐ ছোট্ট গলিটা, যেটাতে আমরা থাকতাম ওটার কোন নাম ছিল না। কেবল একটা নাম্বার-২৪৯। কেন ২৪৯? তা হোক, সেটা এখন বলবার মত বিষয় নয়। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল ঐ গলিপথটুকু দীর্ঘ হয়ে যাক, রাবারের মত লম্বা হয়ে যাক।

আমাকে মা'র সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল, সেই অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতে।

মা আমাকে আর কখনো- না দেখতে পাবেন, না আমার কথা শুনতে পাবেন।

কেমন হয়েছেন মা এ অবস্থায়? কেমন হতে পারে মা'র সাথে আমার এই দেখা? যখন আমাদের বাড়ির সামনের দরজাটা খোলা। আর আমি সেই বন্ধ দরজার কড়া নাড়তে পারিনি। যেমনটা আমি সব সময় করতাম। কি দিনে কি রাতে। মা ঠিক-ঠিক বুঝতে পারতেন আমিই দরজায় দাঁড়িয়ে আছি। আমি দরজার কড়া নেড়েছি আর মা জিজ্ঞাসা করেছেন, কে? এমনটা কখনোই হয়নি। আমি যখন প্রতিবেশীদের টেলিগ্রামটা পেয়েছিলাম, জানতে পেরেছিলাম মা মারা গেছেন। আমি কাঁদতে পারিনি। জানিনা কী হয়েছিল? আমি শূন্য বোধ করছিলাম। কাঁদতে পারছিলাম না। যারা চোখের জল নিয়ে সাহস দেখানোর মত অহংকারী আমি মোটেই সেই সব উঠতি বয়সীদের দলে পরিনা। এমন কি আমার আসপাশে তখন কেউ ছিল না। আমি কাঁদার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ছিলাম। যা আমার পূর্বের যেকোন সময়ের প্রবণতার সাথে মেলে না। আমি চেষ্টা করেও চোখে জল আনতে পারিনি।

রেলগাড়িতে আমি যে কম্পার্টমেন্টে উঠেছিলাম সেখানে কেউ ছিল না। জনশূন্য কম্পার্টমেন্টে মা আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তাঁর সাথে কথা বলেছিলাম। আমার জীবন্ত মা'র সাথে। এরপর আমি তাঁর মৃত্যু কল্পনা করার চেষ্টা করেছিলাম। সামনে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে সে পরিস্থিতিটাকে সহনীয় করার জন্য। যখন আমি মা'র নিথর দেহের  খুব কাছে তখন পর্যন্ত আমার চোখে এক ফোঁটাও জল ছিল না। কিন্তু কেন? কখন আমি আমার মাকে ভালবাসতাম? যখন লেখাপড়ার জন্য আমাকে শহরে যেতে হয়েছিল। তিনি নিতান্ত একা হয়ে পরেছিলেন। আমি সারাক্ষণ ভীত থাকতাম। ভাবতাম, এই চরম নিঃসঙ্গতার মধ্যে মা যদি একদিন মরে যান! একথা ভেবে কেঁদে ফেলতাম। আমি কেঁদেছি, যখন তিনি বেঁচে ছিলেন। আজকের মত আর সব সময় দিন শেষে বড় শহর ত্যাগ করে আমি বাড়ি ফিরতাম। আমার মা আমাকে স্নেহে জড়িয়ে নিতেন। মায়ের হাঁপানি ছিল। অতি আনন্দে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ভারি হয়ে উঠত। তখন তাঁর গলায় হয়তো শ্বাস কষ্টের ফলে খানিকটা ভাঁজ পরেছে। আর আমার চোখ জলে ভরে উঠেছে। কিন্তু এখন আমি পারছিলাম না। এখন তাঁর সামনে দাঁড়াতে আমার ভয় করছিল। আমি কী তাঁকে সেরকমই আবিষ্কার করব? তিনি বেঁচে থাকতে প্রায়শই আমি যেমনটা কল্পনা করেছিলাম।

সামনের খোলা দরজাটা বলে দিচ্ছে মা'র সামনে দাঁড়ানোর সময়টা খুব কাছে চলে এসেছে। খুব কাছে। কোন বাড়ির সামনের খোলা দরজা বলে দেয় বাড়িতে মৃত্যু এসেছে। পাড়াপ্রতিবেশীদের মৃত্যুতে আমার অভিজ্ঞতা ছিল এরকমই। খোলা দরজার সাথে যুক্ত হত বাড়ির মানুষগুলোর টুপিহীন, নিরাভরণ মাথা। কিন্তু এই মৃত্যু তো সেসব মৃত্যুর মত ছিল না। এমন তো নয় যে প্রতিবেশীদের মধ্যে কারো মৃত্যু হয়েছে আর আমরা ছোটরা খেলা ভেঙ্গে দিয়ে কথা বলছি। এটা ছিল আমাকে মর্মাহত, প্রায় উদভ্রান্ত করে দেয়ার মত একটা নিকট মৃত্যু। নিজের ভিতরে কোন কিছু শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়ার মত একটা মৃত্যু। তার পরও কেন আমি কাঁদছিলাম না?

আমি কি তখন কাঁদতে চেয়েছিলাম যখন আমি মা'র ঘরে মোম আর ফুলের রুগ্ন গন্ধের ভিতর প্রবেশ করব?

প্রতিবেশীরা তাঁকে কি ফুল এনে দিয়েছে। আর যা-যা করতে হয় মহিলারা কী তেমনটা করেছে? মাকে সবাই ভালবাসত। যথেষ্ট সমীহ করত। সবাই জানত, আমাদের জীবনটা সহজ ছিল না। যদিও মা কখনোই এ নিয়ে কথা বলতেন না। অভিযোগ ছিল না কারো প্রতি। অন্য সব ছেলেদের তুলনায় আমার কোন কিছুর অভাব আছে এমনটা তিনি আমাকে কোন দিন বুঝতে দেননি। কারণ তাদের সকলের বাবা ছিল, আমার ছিল না।

আমি পৃথিবীর আলো দেখার আগেই আমার বাবা খুন হয়ে যান। ঐ শব্দটা ঠিক কী? আমি কখনোই বুঝতে পারতাম না। তাঁকে নিয়ে মা'র গল্পগুলোই ছিল আমার কল্পনার খোরাক। কিন্তু বাবা আমার কল্পনায় কখনোই জীবন্ত হয়ে ওঠেনি। তিনি ছিলেন ছবির মত নির্বাক আর গতিহীন। আমার থেকে বিচ্ছিন্ন একটা মানুষ। আমার বাবা বিশেষ কেউ ছিলেন না।  সাধারণ সৈনিকও ছিলেন না তিনি। কেবল খুব সাধারণ একজন রেল কর্মচারী। যে কর্মচারীরা রেলগাড়ির কামরা গুলোকে এইঞ্জিনের সাথে জুড়ে দিতেন আর সেগুলো গতি পাবার আগেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসতেন, বাবা ছিলেন তাদেরই একজন। একদিন তিনি সেখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারেনি।

এরপর আমাদের ঘরের দেয়ালে শুধু বাবার ফটোটা  ঝোলানো থাকল। আর ফটোর নিচে একটা চেনের মাথায় ঝুলতে থাকল রেল  কর্মচারীর ব্যবহৃত একটা বড় পকেট ঘড়ি।

প্রতিদিন সকালে মা ওটাতে দম দিতেন। ঘড়িটা তখন বুকের টিপ-টিপ শব্দের মতই চলতে থাকত। এটা নিশ্চিত যে আজ ঘড়িটাতে কেউ দম দেয়নি। বছরের পর বছর সকালে মা যে কাজটি করেছেন, প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ কি সেটি করার কথা ভেবেছে? মনে হচ্ছিল ঘরে সম্ভবত আমি একটি নয় বরং দুইটি মৃত্যু আবিষ্কার করব। মা'র বিছানার পাশে থাকা মহিলাদের ছায়া আমি দেখতে পাচ্ছিলাম।

আমার চোখ তখনো শুকনো।

যতটা মনে আসে আমি  মাকে বিছানায়  কখনো দেখিনি। মনে হত তিনি সারাক্ষণ চলছেন, সারাক্ষণ রান্না ঘরে কিছু একটা করছেন, এরকম। আর তাঁর বিছানাটা  ঢাকা থাকত একটা লাল চাদরে। লাল চাদরে ঢাকা খালি বিছানাটা খুব সুন্দর দেখাত। আমি যখন ঘরের ভিতরে প্রবেশ করেছিলাম, মহিলারা উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। শুধু আমার মা উঠে দাঁড়াননি। তাঁর মুখটা ছিল সাদা। এর আগে আমি কখনোই লক্ষ্য করিনি তিনি এত ফর্সা আর এত সুন্দর ছিলেন। এর কারণ সম্ভবত আগে আমি তাঁকে কখনোই ঘুমন্ত অবস্থায় দেখিনি।আমি যখন বাড়ি আসতাম তাঁকে অবসন্ন মনে হত। অবসন্ন আর মুখে বলি রেখার আঁকি-বুকি। যখন আমি তাঁকে চুমু দিয়েছিলাম হয়ত তাঁর গলায় ছিল শ্বাস কষ্টের ভাঁজ। কিন্তু এবার তাঁর মুখে কোন বলি রেখা ছিল না। আমি তাঁকে চুমু দিলাম। তাঁকে খুব শীতল মনে হল। এই মাকেই কি আমি চুমু দিয়েছিলাম? যেন একটা অদৃশ্য আদেশ পালনের মতই মহিলারা উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু আমি তখনো নির্বিকার। মা'র শিয়রের কাছটায় দাঁড়িয়ে আমি তাঁকে দেখছিলাম। মোমের ছোট্ট শিখা একদম স্থির হয়েছিল। ঠিক মা'র মুখের মত।

আমি কী করব?

আমি আমার মা'র সাথে কথা বলতে পারব না৷ শীতে আমার ঘর যখন হিম হয়ে যাবে, আমি পড়তে থাকব, মা আমাকে কিছুই বলতে পারবে না। আমি যখন পরীক্ষায় পাস করব মা  কিছু জানতে চাইবে না। এমন কি ক্যাফেটোরিয়ার খাবার  কেমন? তাও না।

মহিলাদের চোখ জলে ভরা। তাদের চোখের জল আমাকে তাদের দৃষ্টি থেকে আঁড়াল করে রেখেছিল। আমি কি আমার মাকে ভালবাসতাম না? না কি তাঁর মৃত্যু সংবাদ জানার সাথে-সাথেই আমার ভালবাসার উৎসমুখে একটা পাথর চেপে বসেছিল। আমি কেন কাঁদতে পারছিলাম না? তাঁর শোকে কেন আমার সমস্ত আকাশ ভেঙ্গে পরছিল না? আমার মা মরে গেছে, আমার কিছুই বোধ হচ্ছিল না? কষ্ট, বিষাদ কিংবা হাহাকার! 

মহিলারা কেঁদেই যাচ্ছিল। যারা তাঁর কাছের কেউ নয়। আর আমি, আমার মা'র ছেলে খট-খটে শুকনো চোখে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

ওরকম অবস্থায় মা আমাকে দেখতে পেলে কী বলতেন? খুব কষ্ট পেতেন? না, মা আমাকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু আমি দেখতে পেয়েছিলাম। আমি তাঁর কান্না দেখেছিলাম। যেদিন তিনি আমাকে প্রথম স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর আমি যখন তাঁকে বলেছিলাম, গোটা ক্লাসে আমার স্কুল  ব্যাগটাই ছিল সবথেকে সুন্দর। সেই তখন থেকে আমার প্রত্যেকটা সাফল্য অথবা ব্যর্থতায় তিনি কেঁদেছিলেন।

আর যুদ্ধের পর আমরা যে প্যাকেজগুলো পেতাম। মা তার মধ্যে শুধু চিনি দেয়া মাংসটুকু খেতেন। বাকি সবটাই আমার জন্য রেখে দিতেন। আমি জানতাম মাংস তাঁর মোটেই পছন্দ ছিল না। কিন্তু তিনি সেটাই খেতেন। মাঝে-মাঝে বলতেন, 'মাংসটা খুব ভাল। আমার খুব ভাল লাগে খেতে।’

আমি জানতাম, ওগুলোর প্রত্যেকটা টুকরো গেলা ছিল রীতিমত কষ্টকর।

এত কিছুর পরও আমি কাঁদতে পারছিলাম না। তাঁকে ঘিরে আমার যত স্মৃতি, আগে যেগুলো মনে পড়লে আমার চোখ জলে ভিজে যেত, আমি একটার পর একটা সেগুলো হাতড়ে ফিরছিলাম।
মনে আসছিল আমার সেই মার্বেলগুলো। আমার জীবনের প্রথম মার্বেলগুলো। মা যখন আমার জন্য ঐ মার্বেলগুলো কিনে এনেছিলেন তখন এই গলির আমার বয়সী বাচ্চাদের আর কারো ওরকম সত্যি-মার্বেল ছিল না। আমরা তখন বিস্ফোরিত গ্রেনেডের ছোট-ছোট লোহার টুকরোগুলোকে মার্বেল বানিয়ে খেলতাম। বাচ্চাদের মধ্যে আমিই প্রথম আসল কাঁচের মার্বেলের মালিক হয়েছিলাম। যেগুলোর ভিতর সূর্য প্রতিফলিত হত। ওগুলোর মালিক হতে পেরে আমার মনে হয়েছিল আমি একগুচ্ছ হীরার টুকরার মালিক হয়েছি। সবাই আমার সাথে খেলতে চাইত। আর মার্বেলগুুলোর জন্য আমার প্রতি ঈর্ষা বোধ করত। একদিন আমরা  যখন খেলছি তখন অন্য গলির একটা ছেলে এসেছিল। ছেলেটা ছিল আমাদের থেকে অনেক বেশি বাচাল। মাটিতে ছড়ানো আমার সব মার্বেলগুলো ছেলেটা কুড়িয়ে নিল। আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। জল ভরা চোখে আমি শুধু ছেলেটার ছায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। মুহূর্তের জন্যও ছেলেটার মুখ আমার চোখে পরিস্কার হয়ে ওঠেনি। আমি কেঁদে-কেঁদে বলছিলাম, 'আমার মার্বেল আমাকে ফেরত দাও। আমার সবুজ মার্বেল। ফেরত দাও, ফেরত দাও।’ ছেলেটার ছায়াশরীর যে পথে এসেছে সেপথেই মিলিয়ে গিয়েছিল। আমি কেঁদেই যাচ্ছিলাম। বলছিলাম, 'আমাকে ফেরত দাও আমার মার্বেলগুলো।’

এবার আমি বুঝতে পারছিলাম আমার গাল বেয়ে অশ্রু ফোঁটা গড়িয়ে নামছে। আমি কাঁদছিলাম। প্রকৃতপক্ষেই আমি কাঁদছিলাম। একজন মহিলা আমার কাঁধের উপর হাত রেখেছিল। মহিলাদের মধ্যে অন্য একজন বলছিল, 'ওকে  ওর মত কাঁদতে  দাও, ওর মা, কাঁদলে ও ভাল বোধ করবে।’ চোখের জলে আমার সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল। ঘরের দেয়াল, মা'র বিছানা, মা, প্রতিবেশী মহিলারা সবকিছু। মোমবাতির মাথায় ছোট্ট শিখাকে মনে হচ্ছিল আমার কাঁচের মার্বেলের মধ্যে সূর্যের প্রতিফলন।  বার-বার আমি বলেই যাচ্ছিলাম, 'আমাকে ফেরত দাও আমার মার্বেলগুলো। আমার সবুজ মার্বেলগুলো। ফেরত দাও।’

লেখক: অনুবাদক ও এক্টিভিস্ট

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ