বাস্তব ও মিথের জাদুময়তায় ‘হাওয়া’ গভীর সমুদ্রে

▇  দেবাশীষ ধর


বছরে যে সংখ্যক বাংলা সিনেমা রিলিজ হয় সে তুলনায় ওরকম হলের সংখ্যা অনেক কম। তা বুঝা দায় হয়ে পড়েছে এখন, আরো স্পষ্ট হয় দর্শকে ভরপুর একটা কিংবা দুটো হলে কারণ বাকি সব হল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। একটা সিনেমা বানানো তখনই সার্থক হয়ে উঠে যখন সিনেমাটার জন্য বিভিন্ন শ্রেণির দর্শকদের মনে দাগ কেটে দিতে পারে। সম্প্রতি দু’টা বাংলা সিনেমা রিলিজ হয়— ‘পরাণ’ এবং ‘হাওয়া’। আমি যেবার ‘পরাণ’ দেখতে গিয়েছিলাম চট্টগ্রামের সুগন্ধা হলে টিকেট না পেয়ে চলে এসেছি, এর পরের সপ্তাহে ‘হাওয়া’ রিলিজ হওয়ার দিন শুক্রবারে বিকেলে আগে আগে টিকেট কেটে দেখে ফেলি। ‘পরাণ’ দেখতে না পেয়ে কিছুটা মন খারাপ হলেও খুব আনন্দ হচ্ছে এটা ভেবে যে বাংলা সিনেমা দেখার জন্য হলগুলো একেবারে দর্শক ভরপুর। কিন্তু সিনেমা হল যেসব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অচিরেই খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করা হোক। সিনেমা নির্মাতা, দর্শক, সিনেমা বোদ্ধা, সমালোচক, চলচ্চিত্রানুরাগী, শিল্পীগণ  প্রকৃত যারা তাদের সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে তা অসম্ভব হবে না।


এবার আসি মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’ (২০২২) নিয়ে আলোচনায়। প্রথমত গল্পটা বেশ চমৎকারভাবে শুরু হয়েছে— একটি জলযান নিয়ে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রায় বের হয়েছে আটজন জেলে, যাদের সর্দার নাবিক হচ্ছেন চান মিয়া, তাঁর সহচর ইজা। এরপর ঘটতে থাকে একেকটা ঘটনা। এক রাতে ইঞ্জিন মিস্ত্রী ইবা দেখে ফেলে গোপনে মাছ বিক্রির পঁয়তারা করা যা সর্দার চান মিয়ার সহচর ইজা বিক্রেতার সাথে আলাপ করে। ইবা এর প্রতিবাদ করে যায়, বিক্রি করলে হক সবাইকে সমান দিতে হবে, কিন্তু বাকিরা নিশ্চুপ জেগে জেগে সব দেখেও ঘুমের ভাব ধরে থাকে।একজন ইঞ্জিন মিস্ত্রি ইবা যার কিনা কেবল ইঞ্জিন চালানোই একমাত্র কাজ, মাছে কিভাবে তার হক থাকে এসব চান মিয়া আর সহচর ইজা ইবার বন্ধু নাগুকে বুঝায়। সর্দারের উপর আর কোন কথা থাকতে পারেনা কিন্তু ইবা প্রতিবাদ করে যায়। চুপচাপ বাকি জেলেরা নাগু, উরকেস, পারকেস, ইতি ও আদি। এভাবে শ্রেনিবিভক্তি চরিত্রের মধ্য দিয়ে ‘হাওয়া’র কাহিনী এগোতে থাকে। এরই মধ্যে এক রহস্যময়ী নারী যার নাম হচ্ছে গুলতি, গভীর রাতে তাদের জালে আটকা পড়ে। আটজন জেলেদের জাহাজে এরকম হঠাৎ একজন নারী সবার মাঝে প্রচণ্ড উৎসাহ তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে গুলতি খুবই স্বাভাবিক হয়ে ওদের একজনের মতো হয়ে উঠতে  থাকে। গুলতির চোখ দুটো কি যেন খুঁজতে থাকে, বোবার মতো চুপ থেকে সব পর্যবেক্ষণ করতে থাকে, কিন্তু সর্দার চান মিয়াসহ আরো দু-একজন গুলতিকে কামনার তাড়নায় পেতে চায়। ইঞ্জিন মিস্ত্রী ইবা যখন বুঝতে পারে সব, এরপর ইবার সাথে গুলতির বন্ধুত্ব হলে তার কাছেই গুলতি জানায় চান মিয়ার কথা যে কিনা ছিল একসময় একজন ডাকাত। খুনি ডাকাত কত মানুষকে যে মেরেছে! গুলতি খুনি ডাকাত চান মিয়াকে মারতে চায়। গল্পের গভীরতায় আরো টুইস্ট হতে থাকে গুলতি আসার পর জাহাজে একের পর এক অঘটন ঘটতে থাকলে।

চান মিয়া চরিত্রটি অসাধারণ, সিনেমায় সে একজন খুনি আর শোষক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে যে ঠকাতে চায়, প্রতিনিয়ত হক মারতে চায়, যার চিন্তায় সর্বদা লোভ আর স্বার্থলোলুপে ভরপুর, জাহাজের ছাদে বসে সবার উপর রাজত্ব করে এবং শেষের দিকে নিজের পোষা পাখিটাকে পুড়িয়ে গিলতে থাকে খিদের জ্বালায়। আর ইঞ্জিন শ্রমিক ইবা তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে একজন বিপ্লবী চরিত্রকে ধারণ করে যে কিনা গুলতিকে বাঁচাতে চায় সবসময়। গুলতির প্রতি তাঁর প্রেম সবার কাছ থেকে গুলতির মনে আলাদা জায়গা করে নেয়।একটা রাজনৈতিক আবহ দেশ রাষ্ট্র শোষণ প্রেম ভালোবাসা বিপ্লবের উপাদান প্রতিটি চরিত্রে গল্পটাকে দুর্দান্ত করেছে। উরকেস পারকেস নাগু ওস্তাদের সহকারী ইজার নির্দেশে সর্বদা মাছ ধরার কাজ করে যায় নিরীহ জেলের মতো। ইজা যে কিনা ব্যক্তিগত সহচর চান মিয়ার ডান বাম মত গতি সবি জানে, চান মিয়ার সব কাজের হিসাব-কিতাব তার কাছে থাকে এবং চান মিয়ার ইশারাতে কাজ করে।রহস্যময়ী গুলতি কি মানুষ! নাকি সমুদ্রের মৎস্যকন্যা! নাকি কোন বিষাক্ত নাগিনী! প্রতিশোধ নিতে চাই চান মিয়ার উপর, যা এক ধরনের জাদুময়তায় বাস্তবের মুগ্ধতায় সিনেমাকে আরো শক্তিশালী করেছে।         


সিনেমার সিনেমাটাগ্রাফী একেবারে মর্মস্পর্শী ছিল অনেক দৃশ্যের। প্রথমত বিস্তীর্ণ সমুদ্রে জাহাজের একা ভাসার অপরূপ দৃশ্য চারপাশে পানি যতদূর দেখা যায়। তেমনি জাল পানির ভেতরে ফেলা ক্যামেরার দৃশ্যে তা বাস্তবিকভাবে ধরা পড়েছে, নোঙর ফেলার দৃশ্যখানি দর্শককে সঙ্গী করেছে যেরকম, আবার জাহাজের তলদেশে পানির ভেতর থেকে নেয়া মাছের ঘুরপাক দৃশ্যটি গল্পের আবহের জাদুময়তা তৈরি করেছে দর্শকের ভেতরে। ইঞ্জিনঘরে ইবার ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়া আর চালানোর দৃশ্যে মনে হতে থাকে যেন দর্শকরা জাহাজেই আছে। এই যে দৃশ্যের সাথে দর্শকের হৃদ্যয়স্পর্শী ছায়া কাজ করতে পারাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ইবার শরীরের উপর দিয়ে সাপের চালনার দৃশ্যে সিনেমার শেষে দুর্দান্ত বার্তা দিয়ে যায় দর্শকদের মনে।এছাড়াও এ্যাকশনধর্মী দৃশ্যগুলো বাস্তবের মতো মনে হয়েছে।  

চান মিয়ার চরিত্রে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী অসাধারণ করেছেন, তাঁর মেকাপ এবং গেটাপ এর সাথে চরিত্রের দক্ষতা বুঝা যায় চমৎকার অভিনয়ে। আর ইবা চরিত্রে শরিফুল রাজও চমৎকার করেছেন। তাঁর প্রতিবাদী মুখ, সংলাপে অভিনয় না মনে হয়েছে সত্যিকারি সেই। এছাড়াও নাগু চরিত্রে আমাদের চট্টগ্রামের মঞ্চ অভিনেতা নাসির উদ্দীন খান অনেক রসাত্মক ফুটিয়ে তুলেছেন। গুলতি চরিত্রে নাফিজা তুষি ভালো করেছেন। বাকিরাও বেশ ভাল করেছেন প্রতিটি চরিত্রে।


মুভির গান ‘সাদা সাদা কালা কালা’ গানটি যখন থেকে শুনছি সিনেমার মুক্তির আগে থেকেই সিনেমা দেখার ইচ্ছাটা খুব বেশি জেগে উঠে এরকমটা বেশিরভাগ দর্শকদের মধ্যে দেখা গিয়েছে। হলে বসে সিনেমা দেখতে গিয়ে সবাই গানটিতে খুব উপভোগ করেছে। জেলেদের জীবনে মাছ ধরাটাই মুখ্য কাজ এবং দুর্গম সমুদ্রে মাছ ধরার মতো অত্যন্ত সাহসী কাজ তারা করে থাকে আর কাজের ফাঁকে গান বাজনায় কিছুটা ফুর্তির যে আনন্দময় পরিবেশমাখা জাহাজজুড়ে যা দেখা যায় তা একেবারে গানের সাথে মিলে যায়। একটা সিনেমাকে দর্শকদের মনের মধ্যে খুব সহজে নিয়ে যেতে পারে সিনেমার গানের মুগ্ধতা আর সেই গান যদি মনের মতো হয়। দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করেছে বলেই গানটির সুরে সিনেমাটাও তত বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। ‘তুমি বন্ধু কালা পাখি’ গানের জন্য ইমন চৌধুরী ও গায়ক এরফান মৃধা শিবলুকে মন থেকে স্যালুট জানাই। ভালোবাসা এই সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যান্ড ‘মেঘদল’কেও। ‘হাওয়া’ সিনেমার আবহ সংগীত করেছেন রাশিদ শরীফ সোয়েব এবং গানের সঙ্গীতায়োজন করেছেন ইমন চৌধুরী। আবহ সংগীত কিংবা সাউন্ড এর ব্যবহারও ভালো লেগেছে।


সিনেমার বেশ কিছু দৃশ্য আছে যা অন্যভাবে দেখানো হয়েছে। অনেক দৃশ্যে যা এক ধরণের নতুনতা বা আলাদা ধাঁচের যা আপনাকে অন্যভাবে ভাবিয়ে তুলবে। যেমন— সমুদ্রের বাতাসের মধ্যে বিড়ি বা সিগারেট ধরানো। ম্যাচ ও বিড়ি নেওয়া হয় গেঞ্জির ভেতরে, চান মিয়া চরিত্রে চঞ্চল এভাবে বিড়ি ধরিয়ে তাক লাগিয়ে দেয়। তামাক খাওয়া নাগু চরিত্রে নাসিরুদ্দিন খান বিড়ি বা গাঁজা নিয়ে সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দেয় আবার ভুস করে উঠে এসে সেই বিড়িতে টান দেয়, পুরোই এক মজাদার ব্যাপার। তার বিড়ি বা গাজার আগুন জল নেভাতে পারে না, ঠিকই সেখান থেকে ধোঁয়া বের হয়! আবার যখন নাগুর হাত থেকে বাঁচতে গুলতি তার অণ্ডকোষে লাথি মারে, তখন সেখানকার ব্যথার আগুন নেভাতে বরফের ব্যবহারও দর্শকদের এক ধরনের ভাবনায় ফেলে দেয়। চান মিয়ার পোষা পাখি, যে কিনা নয়নতারা জাহাজে শুরু থেকে মালিকের সাথে থাকা,কথা বলা এবং রাতের আঁধারে পাখিটাকে মালিক ছেড়ে দেয় আশেপাশে ঘাট থাকলে ফিরে আসবেনা এই ভেবে বুঝার জন্য কিছুক্ষন পর সে আবার ফিরে আসে জাহাজে,কি অসাধারণ দৃশ্য সংযোজন। এরপর সব শেষে একটি সাপ ধীরে ধীরে ইবা’র শরীরের উপর অস্বাভাবিকভাবে বিচরণ করার এই দৃশ্যটিতে আটকে যায় অনেক দর্শকদের চোখ অজানা ভাবনায়।

কিছুটা মিথ এর সংমিশ্রণ বাস্তবের সাথে অধিবাস্তবের তাগিদ সিনেমার দৃশ্যায়নে কাহিনীর সাথে একাত্ম হয়ে যায়। চান মিয়া একজন ডাকাত ওরফে জেলে সর্দার যার কাজই হচ্ছে লুটপাট করে ছিনিয়ে নেয়া যা কিনা একজন বুর্জোয়া চরিত্রকে ধারণ করছে। উরকেস পারকেস নাগু সাধারণ জেলে সাধারণ জনগণের মতো আর ইবা সংগ্রামী বিপ্লবী চরিত্র যা অনবরত প্রতিবাদ করে আসছে চান মিয়ার বিরুদ্ধে সেই সাথে গুলতির প্রতি তাঁর সবসময় সাপোর্ট যা চান মিয়াকে আরো রাগান্বিত করে। গুলতিকে ইবা ভালবেসে ফেলেছিল এবং গুলতির প্রতি প্রেমে সে সমস্ত বাধাকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছে। গুলতি রহস্যময়ী একজন নারী কিংবা নাগিনী অথবা মৎস্যকন্যা যে কিনা চান মিয়ার সাম্রাজ্যকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করতে আসে, চান মিয়েকে উচিৎ শিক্ষা দিতে আসে যেন এক দেবীরূপী হয়ে। এভাবে তাকে বহুভাবে ভেবে নেয়া যায়।    

‘হাওয়া’র পরিচালক, অভিনেতা, গায়কসহ পুরো টিমকে অনেক অনেক ভালবাসা এবং নয়নতারা জাহাজের আট জেলের কাহিনী নিয়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রও যাতে ভালবাসার সমুদ্রে ভাসতে থাকে সেই আশাবাদ করি। ইতিমধ্যে বাইরের অনেক দেশে সিনেমাটি প্রদর্শনী হচ্ছে। প্রবাসী বাঙালিরাও খুব মজা করে সিনেমাটা উপভোগ করুক সেই কামনা করি।

লেখক: কবি, গল্পকার ও সম্পাদক ঘুনপোকা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ