ইনু দোতলার বারান্দায় ঝড়ুকে সামনের বাড়ির মেয়েকে ডাকলে—'বুলি, ও বুলি, জানিস আমার মামাবাবু আসছেন।' বুলি ওবাড়ির জানলায় দাঁড়াতেই, তার পাশ দিয়ে তার ভাই শুঁটে মুখ বার করে বললে, (তার মুখে সব “শ” এবং “” ইরেজী s-এর মত) 'তোমার কোন মামা ইনুদি, (sই কাগজে লেখে—খুব বিদ্বান? (sই (sবার তোমার মামী আর মামাতো ভাইবোনকে নিয়ে রিsকা করে আসতে গিয়ে ঐ গলির মোড়ে যাঁর সন্দে(sর কৌটো আর তিনটে চামচ পড়ে গিয়েছিল, আমি, ফুটো কুড়িয়ে দিয়েছিলাম?” ও পাশ থেকে ফুটো বলে উঠল, ‘চামচে তিনটে নয় s্যার, একটা হাতা, দুটো চামচে আর এক পাটি চটি, আমার মনে আছে; আর কৌটয় সন্দেশ ছিল না, কালাকাঁদ ছিল, আমি অনেকটা খেয়ে—' বুলি বাধা দিয়ে বলে উঠল, ‘উঃ যাঃ যাঃ, তোদের ইনুদি ফোড়ন দিতে ডাকেনি! বেরো এখান থেকে!' শুঁটে বললে, 'দাঁড়া যাচ্ছি। ইনুদিকে একটা কথা জিজ্ঞেs করেই চলে যাব। তোমার মামাবাবু, আমাদের s।হিত্য সভার সভাপতি হবেন ত ইনু দি ? কোনো বড়লোক পাওয়া যাচ্ছে না, সবাইকে siঙ্গির গলির যুবক sংঘ ভাঙ্গিয়ে 'নিচ্ছে।' ইনু বললে, 'বেশ ত দুপরে খাওয়ার পর তোরা কয়েকজন আসিস, আমি মামাবাবু কে বলে দেব।”
তাই হল। কিন্তু বলাটা সহজে হল না। ইনুর কাছে সাহিত্য সভার কথা শুনে মামা যখন চশমাটা তাঁর উঁচু তীক্ষ্ণ নাকের ওপর ঠেলে তুলে কট্মট্ করে শুঁটে ফুটোর দলের দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কারা করবে সভা! এরা?” তখন সবাই ভয় পেয়ে চুপ করে আছে দেখে শুঁটে দাঁত বের করে হেসে বলতে আরম্ভ করেছিল, 'হ্যাঁ s্যার, আমরাই Sভা করব, s।হিত্য sভা—' কিন্তু 'কী কী, কী বললে?' গর্জন শুনে আর এগোতে পারেনি। ইনু উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে সামলে নিয়েছিল অবশ্য। বিনীত হাসি হেসে সে বলেছিল, 'ওর জিভটা একটা কেমন আছে ছোটবেলা থেকে, তাই সব কথাই ওই রকম বলে। এরাই সাহিত্য সভা করবে একটা। একটা রচনার প্রাইজ দেওয়া হবে। আপনি যদি সভাপতি হন তবে আপনিই দেবেন। আর রচনাটা কি করে লেখা হবে তাও একটু বলে দেবেন ওদের।' মামার মনটা বোধ হয় নরম হয়ে আসছিল, কিন্তু ওদের দলের সর্দার মত একটা ছেলে প্রথম ভয়টা ভেঙ্গে যেতেই ফস্ করে বলে বসল, 'রচনাটা আর কি বলে দেবেন। রবি ঠাকুরকে নিয়ে লেখা—মানে রবি ঠাকুরের জন্মদিন কি না'—'কি মাস এটা?' একজন ছেলে বললে 'ভাদ্র', একজন বললে, 'দূর, শ্রাবণ'। আর একজন ‘জুলাই, অপর একজন ‘আষাঢ়'। মামাবাবু আষাঢ়ের মেঘের মত মুখ এবং অনেকটা তারই শব্দের মত গলায় প্রশ্ন করলেন, 'রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন কোন মাসে?
তারিখ কি? ফুটো ছিল সামনে, সে হকচকিয়ে বলে ফেললে, ২৫শে ডিসেম্বর।' আর যায় কোথা, মামা কি দিয়ে মারবেন খুঁজতে গিয়ে দেখেন সামনে ছেঁড়া কাগজের রাশ, আর খান কয়েক চটি খাতা ছাড়া কিছু নেই। ইতিমধ্যে একটি ফুট্ফুটে মেয়ে এগিয়ে এসে হেসে বললে, 'আমি জানি মামাবাবু ২৫শে বৈশাখ, ইস্কুলে দিদিমণি বলে দিয়েছেন। ওরা কিছু জানে - না, ২৫শে ডিসেম্বর ত বড় দিন।' মামার মেজাজ বোধ হয় মেয়েটির মিষ্টি মুখ দেখে আর ঠিক কথা শুনে খানিক শান্ত হল। তিনি গুরুগম্ভীর ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কি?' সে বললে 'পিউ'। 'আর তোমার ?" প্রশ্নটা শুঁটেকে। শুঁটে ভয়ে ভয়ে বললে, বু-বু-বুদ্ধদেব S-S-sেনগুপ্ত। পিউ তাকে কনুইয়ের গা তো মেরে নীচু গলায় বললে, 'যাঃ, তোর নাম তো দেবব্রত, ফুটোর নাম তো বুদ্ধদেব।' একট, উঁচু গলায় মামাবাবুকে হেসে হেসে বুঝিয়ে দিলে— 'ওদের দুজনের নাম কিছুতেই মনে থাকে না, ইস্কুলে নাম লিখিয়েছে, তাও ভুলে যায়। শুঁটে আর ফুটো বলে ওদের ডাকা হয় কি না—'। ফুটো, হাঃ হাঃ হাঃ! ফুটো আর ছেঁদা হলে আরও ভালো হত। সব বিদ্যেবুদ্ধি ফুটো আর ছেঁদা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে— হাঃ হাঃ হাঃ! সকলকে অবাক করে তিরিক্ষি মেজাজ মামা হঠাৎ মাথা ঝাঁকিয়ে এমনি হেসে উঠলেন যে নাক থেকে চশমাটা ফট্ করে তাঁর লেখা আলগা কাগজের গাদার উপর পড়ে গেল । ঠিক সেই সময় আবার একটা দমকা বাতাসে কাগজগুলো উড়ে ঘরময় হয়ে যেতে লাগল। তখন 'ধর্ ধর্' রব উঠল। ছেলেমেয়ে যারা এসেছিল তারা মহানন্দে ঘরে ঢুকে কাগজ কুড়িয়ে এনে মামাবাবুকে দিতে লাগল। এভাবে দৈব দুর্যোগে সন্ধি স্থাপনটা ভাল মতই হয়ে গেল। ফুটো যখন চশমাটা হাতে দিলে তখন তিনি খুসি হয়ে বললেন, 'বেশ, বেশ, কি রচনা লিখবে বল । ভাল করে লিখতে হবে কিন্তু, ফাঁকি নয়।' সেই সর্দার ছেলেটা আবার ফাঁসালে, খনখনে গলায় বলে, 'ওটা ত ডাঃ নিতাইপদ মিস্ত্রীর “রচনা চয়নে” খুব ভাল আছে। আমার সবটা মুখস্থ হয়ে গেছে। শুঁটে বললে, 'ভুলুদার রচনা বইয়ে ওর চেয়ে ঢের বড় আর ভাল রচনা আছে, দেখ্গিয়ে চন্দ্র তার থেকে মুখস্থ করেছে। তোর আর ফাস্ট হতে হবে না!' মামাবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন— রচনা মুখস্থ ? কার রচনা? কি নিয়ে? ভাল রচনা-লিখিয়ে চন্দ্র বললে, 'কেন, কবিগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে।' পিউ তখন ব্যাখ্যা করে বললে, আমাদের ত ঐ রকম করেই প্রাইজ দেওয়া হয় মামাবাবু। সেবার আমাদের জুনিয়র বেসিকে যখন রচনা পোতিযোগিতা হল তখন তেলি- পাড়া বেসিক ফার্স্ট হয়ে গেল ত ঐ জন্যেই। ওদের মাস্টার মশায় রচনাটা বোর্ডে লিখে দিয়েছিলেন, আর ওরা সব মুখস্থ করে এসে ফাস্ট আর ফোর্থ হল। আমরা থাড আর সেকেন হলুম। আমাদের দিদিমণিও লিখে দিয়েছিলেন খাতায়, তবে তাঁরটা তেমন বড় হয়নি।' কথা শুনে মামাবাবু খানিক হাঁ করে রইলেন, তারপর দরজার দিকে আঙুল তুলে হাঁকলেন, ‘বেরোও সব।”
এমন সময় নীচে একটা বিষম হট্টগোল, কুকুরের ডাক, মানষের চেচামেচি, সবায়ের উপর ইনুর জ্যাঠাইমার হিন্দীতে বকুনি শোনা গেল। জ্যাঠাইমা বলছিলেন—'আরে বাবা দুপুরমে একটু চোখের পাতা এক করতে পারতা নেহি। কী পায়া তুম- লোক, কুকুরকে লোভ দেখাতা কাঁহে, কাঁহে ফিন্ পিটতা? উ কৃষ্ণের জীব হ্যায় কি নেহি?' ছেলের দল ও ইনু ছুটে নীচে গেল। ব্যাপার এই যে একটা লোক ওদের রকে বসে থাকে, আর একটা কুকুরকে রুটির লোভ দেখায়, কিন্তু যেই সেটা কাছে আসে অমনি ঠেঙায়; কুকুরের কেঁউ কেঁউ শব্দে পাড়া মাত। জ্যাঠাইমার ঘরটা ঠিক রাস্তার ওপর, কাজেই তিনি ভীষণ রেগে গেছেন। সেই অদ্ভুত লোকটা রুখে দাঁড়িয়ে তার বাংলায় বলছে—'হামি পাবলিকের রাস্তামে যেই খুসি করবো। হামি ত হাঁপনার ঘরে ঘুসকে কুকুর মারছি না।' কুচো কাগজগুলোর উপর দুটো বালিশের পেপার ওয়েট চাপিয়ে, ইনুর মামাবাবুও ইতিমধ্যে এসেছিলেন। তিনি গিয়ে সোজা লোকটার ঘাড়ে হাত দিয়ে বললেন, 'ভদ্রমহিলার সঙ্গে ওরকম করে কথা বলতে হয় না।' লোকটা এধার ওধার চেয়ে বললে, 'ভদ্দর মহিলা কাঁহাকা বাবু, উন্হি ত চাটুজ্জি বাড়ির মেঝোমা, উন্হি ভদ্দর মহিলা হোবেন কেনো? উহি ছাতা আর বেগ্ লেকর ইস্কুল যান?” এমন সময় ভট্ ভট্ শব্দ করতে করতে একটা মোটর সাইকেল এসে দাঁড়াল, এবং তার থেকে নেমে এলেন ইনুর বাবা। ফরসা মোটাসোটা হাসিমুখ মানুষটি। তিনি যেই বললেন, 'কি রে ফকির, আজ আবার কি হল?' অমনি লোকটা ভালমানুষের মত রাম রাম বাবুসাব' বলে চট্পট সরে পড়ল। অন্য লোকের ভীড়টাও পাতলা হয়ে গেল। ইনুর বাবা তখন মামার কাছে এসে বললেন, 'লোকটা আধ-পাগলা। ওর একটা কুকুর ছিল, আর কেউ ছিল না, নেইও। রিকসা টেনে টেনে যা পেত কুকুরটাকে খাওয়াত। সেই কুকুরটা ওর শত্রুরা বিষ দিয়ে মেরে দেয়—, সেই থেকে ওর মাথাটা গোলমাল হয়ে গেছে। কুকুরকে ডেকে খাওয়ায়, মারেও। মরবার সময় আমি কুকুরটাকে কিছু ওষুধ দিয়ে দেখছিলাম বাঁচান যায় কি না, তাই আমার কথা খুব শোনে। কই দাদা, চলুন ওরা চলে গেছে।' কিন্তু মামা আর নড়েন না। অনেকক্ষণ পর যেন জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, ‘রচনা লিখবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মুখস্থ করে! কেন, ঐ লোকটাকে নিয়ে লিখুক না, যাকে চোখে দেখতে পাচ্ছে। কোনো রচনার বইয়ে ত ওর কথা লেখা নেই। এই, কোথায় গেলে তোমরা!' ফুটো আর চন্দ্র কাছেই ছিল। তখন সেই পথের উপর দাঁড়িয়ে ঠিক হল যে ওরা রচনা লিখবে ঐ ফকিরকে নিয়ে। মুখস্থ ত লেখাই যাবে না উপরন্তু বাড়ি থেকে কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়াও যাবে না। কারণ, প্রতিযোগীদের ইনুদের বাড়ি এসে তাঁর সামনে বসে লিখতে হবে। মামা বললেন পুরস্কার তিনিই দেবেন—প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার থাকবে। যেদিন সভা হবে সেদিন পুরস্কার বিতরণ করা হবে এবং ভাল রচনা পড়া হবে। মামা সভাপতি হয়ে নিজহাতে পুরস্কার বিতরণ করবেন। মামা-আকাশের কালো কেটে গিয়ে হঠাৎ এত সূর্যের আলো বেরিয়ে পড়াতে ফুটো আর চন্দ্র আহ্লাদে আট- খানা হয়ে ছুটল দলবলকে খবর দিতে, কিন্তু আনন্দের চোটে যে মোচড়ান কার্ডখানা মামার হাতে দিয়ে গেল সেটার জন্য আবার ইনুকে কিছু বেগ পেতে হল। উপরে এসে চশমা পরে মামাবাবু কার্ডখানা দেখলেন। সেটা এই রকম ঃ-
“মাজের পাড়া জুবক শংঘো”
ভাগ্যে “জবক বিন্দের” কেউ মামার হাতের কাছে ছিল না! ইনু অনেক কষ্টে সিঙ্গীর গলির যুবক সংঘের বুড়ো বুড়ো ছেলের এ বেচারাদের পিছনে লাগা এবং ২৫শে বৈশাখ থেকে আজ পর্যন্ত এদের সভা করার সমস্ত চেষ্টা ভণ্ডুল করে দেবার করণ বর্ণনা শুনিয়ে মামাকে ঠাণ্ডা করলে। এদের যে তিনিই একমাত্র আশা-ভরসা একথাও জানাতে ভুললে না। কারণ সিঙ্গীর গলির সাহিত্য সভার যতই জাঁকজমক হোক, সভাপতি হয়েছিলেন হাইস্কুলের একজন মাস্টার মশায়। আর এদের হবেন একজন সত্যকার লেখক, কাগজে ছাপার অক্ষরে যাঁর নাম বেরয়! জিতল কারা ?
কিন্তু সভাপতি মশায়ের কড়া শর্তের জন্যেই বোধহয় নির্দিষ্ট দিনে মাঝের পাড়া 'জুবক শংঘে'র মাত্র চারটি সভ্য রচনা লিখতে ইনুদের বাড়ি এল।
যে ক'জনই লিখক, কেমন লিখেছে নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধিতে দেখাতে গিয়ে মামাবাবু ও ইনুদেরই চক্ষু স্থির। হায়, হায়, মুখস্থ-রাক্ষসীকে কিছুতেই ঠেকান গেল না, সকল পথ বন্ধ দেখে সে গুপ্ত পথে রচনার মধ্যে প্রবেশ করে বেশ জাঁকিয়ে বসে গেছে। প্রথম রচনাটি এই রকম :-‘ফকির পাগল রকে বসে। ফকিরকে লইয়া কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ একটা গল্প লিখিয়াছিলেন। গল্পটি ফাইভের বইয়ে আছে। বেশ লিখিয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মহর্ষি দ্বারকানাথের পুত্ত। ইহার পিতার নাম অবনীন্দ্র ঠাকুর। ভারতের আকাশে রবি উদিত হইয়া পামর সাধারণের হিদয়ে অন্দকার দূর করিয়া যে য্যোতি কিরণ বিকরণ করিতেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।'
লেখকের নাম—চন্দ্রকান্ত গড়াই। আরও দুটি রচনা এমনি ভাবে ফকিরের নামের সাহায্যে রবীন্দ্রনাথকে টেনে এনে মুখস্থ করা রচনা নানা ভুল সমেত লেখা হয়েছে। বোধ হল লেখকরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেই এসেছিল। একটি মাত্র রচনা পাওয়া গেল যেটি মুখস্থ নয়, আসল ফকির সম্বন্ধেই লেখা ৷ সেটি এই—‘ফকির বলে একটি লোক ছিল। সে চাটুজ্জে বাড়ির রকে বসিত। উহার একটি কুকুর ছিল। তাহার নাম ভুলো। ভুলোকে ফকির খুব ভালবাসিত। সামনের বাড়িতে একটা ফণি বলে ছেলে আছে। সে সিঙ্গীর গলির জুবোক শংঘের ছেলে। সে খুব পাজী। সে কুকুরটাকে বিষ খাইয়া দিল। কুকুরটা ধড়- ফড় করিতে লাগিল। আমি কত জল দিলাম, সে খাইতে পারিল না। ইনুদির বাবা বিমলকাকু অষুধ দিলেন। তবু, ভালো বাঁচিল না। মুখে ফেনা উঠিতে লাগিল আর চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল। শেষে মরিয়া গেল। ফকির তখন পাগল হইয়া গেল এবং কাঁদিতে লাগিল। ছেলেগুলো খুব হাসিল। আমার কান্না পাইছিল তাই পলাই গেলাম। আমার খাইতে ভাল লাগিল না। সব বমি হইল। বিছানায় শুইয়া ভুলোকে মনে পড়িল। আর আমার মাকে মনে পড়িল। মাও মরিয়া গিয়াছে।'
লেখকের নাম বুদ্ধদেব সেনগুপ্ত, অর্থাৎ ফুটো। মামা কেন জানি না রচনার শেষ দিকটার দিকে চেয়ে বসেই রইলেন খানিকক্ষণ, তারপর ইনুর দিকে তাকিয়ে বললেন— 'দেখ এরা কেউ ফুটোও নয় ছেঁদাও নয়। আমরা বুড়োগুলো এদের ফুটো করে দিচ্ছি।' মামাবাবু মাঝে মাঝে ঐ রকম আবোলতাবোল বকেন, তাই ইনু তাড়াতাড়ি প্রাইজ কি দেওয়া হবে সেই কথা তুলল। মামা বললেন, 'সে আমার ঠিক আছে; তুই সভার জোগাড় কর।'
পরের দিন বিকালে ইনুদের উঠোনে ছোট্ট বেদীতে সভাপতিকে মালা দিয়ে বসিয়ে, সামনে আলপনা দিয়ে ফুল দেওয়া ঘট সাজিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে সভা যা হল, সিঙ্গীর গলির যুবক সঙ্ঘের মাইক আর চেঁচানি তার কাছে ম্লান হয়ে গেল। ইনুর গান, পিউয়ের নাচ ও মাঝের পাড়ার একজন 'জুবকের’ আবৃত্তি খুব জমল। আর সব চেয়ে ভাল হল এই যে, সভাপতি একজন আস্ত লেখক হয়েও একটু ও বক্তৃতা দিলেন না। কেবল ফুটোর রচনা পাঠের পর বললেন যদি মাঝের পাড়ার যুবক- বৃন্দ না মুখস্থ করে রচনা লেখার এবং বানান ঠিক লেখার অভ্যাস করে তবে আসছে বছরও তিনি তাদের পুরস্কার দেবেন। প্রথম পুরস্কার ৬টি কাবলী কলা, ১টি মোটা খাতা ও ১টি পেন (বানান ভুলের জন্যে নেপথ্যে সভাপতির হস্তে একটি কানমোলা)। ফুটো ঘন ঘন হাততালির মধ্যে প্রথম পুরস্কার নিলে। কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার নিতে কেউ এল না। কারণ ঐ পুরস্কার প্রাপকদের নামের সঙ্গে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল, যথা—দ্বিতীয় পুরস্কার কলা-খাতা-ইত্যাদি-হীন চারটি চড় ও একটি কানমোলা। তৃতীয় পুরস্কার—ছয়টি চড় ও দুইটি কানমোলা।
মামাবাবু বড় একটা কলার কাঁদি এনেছিলেন, আর ইনুর বাবা প্রকাণ্ড এক ঠোঙা ভাজা চীনা বাদাম। তার থেকে মাঝের পাড়ার “জুবক বিন্দের” প্রত্যেককে প্রচুর “সান্ত্বনা পুরস্কার” দেওয়া হল। সঙ্গে ইনুর মায়ের তৈরী ঝাল-মশলা। তাই সকলেই খুসি হয়ে বাড়ি গেল।

0 মন্তব্যসমূহ
প্রাসঙ্গিক ও মার্জিত মন্তব্য করুন